Categories
রোগের লক্ষন ও প্রতিকার

এপেন্ডিসাইটিসের লক্ষণ

এপেন্ডিসাইটিস (Appendicitis) বলতে সাধারনভাবে এ্যাপেন্ডিক্সের প্রদাহ বোঝায়। অ্যাপেনন্ডিক্স হচ্ছে ২ থেকে ২০ সে.মি. দৈর্ঘের নলাকার একটি অঙ্গ। এটি বৃহদন্ত্রের সাথে সংযুক্ত অবস্থায় থাকে। যদি কোনো কারণে অ্যাপেনন্ডিক্সের মধ্যে ইনফেকশন হয়, তখন এটি ফুলে যায় এবং প্রদাহ হয়। একেই অ্যাপেনডিসাইটিস বলে। দ্রুত এর চিকিৎসা না করা হলে মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকায় অ্যাপেন্ডিসাইটিসকে অত্যন্ত জরুরী অবস্থা হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং অপারেশনের মাধ্যমে দ্রুত এ্যাপেন্ডিক্স অপসারণ করা হয়।

এপেনন্ডিক্স কোন কারনে ফেটে গেলে জীবাণু সমগ্র পেটে ছড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থা পেরিটোনাইটিস নামে পরিচিত। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থা। এরকম হলে রোগীর মৃত্যুঝুকি থাকে। আবার কম তীব্রতার এ্যাপেন্ডিসাইটিস আছে যেটা এ্যাপেন্ডিসাইটিস রাম্বলিং হিসাবে পরিচিত। তলপেটে হঠাৎ করে ব্যথা উঠলেই সেটা অ্যাপেনডিসাইটিসের ব্যথা নাও হতে পারে। এরকম ক্ষেত্রে, চিকিৎসকের পরামর্শ মত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে পেটের ব্যথা থেকে মুক্ত হওয়া যায়।

এপেন্ডিসাইটিসের কারণ

এ্যাপেন্ডিক্সের ভেতরে প্রতিবন্ধকতার ফলে ব্যাকটেরিয়ার দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি হয়ে এ্যাপেন্ডিক্স ফুলে ওঠে এবং এতে পুঁজ জমতে শুরু করে। দ্রুত চিকিৎসা করা না হলে এই এ্যাপেন্ডিক্স ফেটে রোগীর জীবননাশের সম্ভাবনা আছে।

কাদের এ্যাপেন্ডিসাইটিস হতে পারে

  • এ্যাপেন্ডিসাইটিসে আক্রান্তের কোন নির্দিষ্ট বয়স নেই। যেকোনও বয়সেই এ্যাপেন্ডিসাইটিস হতে পারে। তবে ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে যাদের বয়স, তাদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
  • অনেক ক্ষেত্রে এ্যাপেন্ডিসাইটিস জন্ম বা বংশগত কারণেও হয়ে থাকে। পরিবারে পূর্বে কারো এই রোগটি হয়ে থাকলে তবে শিশুদের এই রোগটি হতে পারে।
  • এ্যাপেন্ডিসাইটিস সারা বছরই হতে পারে তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শীতকালে অর্থাৎ অক্টোবর থেকে মে মাসের মধ্যেই হয়ে থাকে।
  • পুরুষদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা মহিলাদের তূলনায় কিছুটা বেশি।
  • ফাইবার জাতীয় খাবার কম খেলে এবং রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ বেশি খেলে এ্যাপেন্ডিসাইটিস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
  • ছেলে শিশুর ক্ষেত্রে, সিস্টিক ফাইব্রোসিসে ভুগছে এরকম শিশুদের এ্যাপেন্ডিসাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
  • Gastrointestinal infections যেমন Amebiasis, Bacterial Gastroenteritis, Mumps, Coxsackievirus B এবং Adenovirus এর ইনফেকশনের ফলে এ্যাপেন্ডিসাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

অ্যাপেন্ডিসাইটিস এর লক্ষণ বা উপসর্গসমূহ

অ্যাপেন্ডিসাইটিস হলে নিম্নলিখিত লক্ষণ বা উপসর্গসমূহ দেখা যেতে পারেঃ

  • পেটে একটানা ব্যথা হতে পারে। ব্যথা নাভির চারদিকে থেকে শুরু হয় এবং ক্রমশ বাড়তে বাড়তে কিছুক্ষণের মধ্যেই নাভির নিচের অংশে ডানদিকে সরে যায়।
  • ক্ষুধামন্দা অর্থাৎ খিদে কমে যেতে পারে।
  • কাশি হতে পারে।
  • কোষ্ঠকাঠিণ্য হতে পারে।
  • জ্বর হতে পারে।
  • পেটফাঁপা
  • ডায়রিয়া
  • ঠাণ্ডায় কাঁপুনি
  • শরীরে সাইড পেইন হতে পারে।

এপেনডিসাইটিস নির্ণয়ে পরীক্ষা

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগী দেখে এবং তার অভিজ্ঞতা থেকে অনেক সময় কোন পরীক্ষা না করিয়েও রোগীর এপেন্ডিসাইটিস হয়েছে কিনা তা কিছুটা নিশ্চিত করতে পারেন। যেমন- যদি রোগীর কাশতে গেলে পেটে তীব্র ব্যথা অনুভুত হয়। আবার যদি তলপেটের বামদিকে চাপ দিলে ডানদিকের তলপেটে তীব্র ব্যথা অনুভুত হয় অথবা তলপেটের ডানদিকে চাপ দিলে বামদিকের তলপেটে তীব্র ব্যথা অনুভুত হয়, তাহলে সেটা এপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা হতে পারে। আবার পেটের ডান দিকের নিচের অংশে নানান কারনে ব্যথা হতে পারে, বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে। তাই, অপারেশনের পূর্বে চিকিৎসককে নানান বিষয় যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে যে এটা এ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথা কিনা। আলট্রাসনোগ্রাম বা রক্ত পরীক্ষা অ্যাপেনডিসাইটিস নির্ণয়ে সহায়ক হতে পারে।

চিকিৎসা

এপেন্ডিসাইটিস হলে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারন- সময় মত অপারেশন না করলে অ্যাপেনন্ডিক্স ছিদ্র হয়ে ইনফেকশন পুরো পেটে ছড়িয়ে যেতে পারে এবং এতে রোগীর মৃত্যুর আশংকা আছে। যেহেতু এপেনডিসাইটিসের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা হচ্ছে অপারেশন, তাই দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অপারেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক্ষেত্রে প্রয়োজন মনে করলে চিকিৎসকেরা এই রোগে আক্রান্ত রোগীকে Ampicillin, hemihydrate, cefepime hydrochloride, metronidazole, ciprofloxacin, gentamicin, levofloxacin, moxifloxacin, morphine sulphate ইত্যাদি ঔষধ গ্রহনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

অপারেশন পরবর্তী সতর্কতা

  • ল্যাপ্রোস্কোপির মাধ্যমে অপারেশন করা হলে, কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ দিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। অপরদিকে যদি ওপেন এপেনডেকটোমি করা হয়, তাহলে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৪ দিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। অপারেশন পরবর্তী সম্পূর্ণ সুস্থ্য হতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে।
  • ঘুম বোধ হলে বা ক্লান্ত লাগলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে। কাশি, হাসি অথবা নড়াচড়া করার পূর্বে তলপেটের উপর একটি বালিশ রেখে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। এটি ব্যথা কমাতে সাহায্য করবে। পেইনকিলার খাওয়া সত্ত্বেও ব্যাথা না কমলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
  • অপারেশন পরবর্তী ঝুকি কমাতে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিশ্রাম করতে হবে। শিশুরা অপারেশনের এক সপ্তাহ পরে স্কুলে যাওয়া শুরু করতে পারবে তবে শ্রমসাধ্য কাজ যেমন জিম বা খেলাধুলা পুনরায় শুরু করার পূর্বে কমপক্ষে ২ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় নেয়া উচিত। নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হলে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরে যেতে হবে।

সবশেষে

এপেন্ডিসাইটিস আছে এমনটা সন্দেহ হলে দেরি না করে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারন সঠিক সময়ে চিকিৎসা করা না হলে এ্যাপেন্ডিক্স ফেটে যেতে পারে এবং জীবাণু পেটে ছড়িয়ে যেতে পারে। এটা পেরিটোনাইটিস নামে পরিচিত। এ্যাপেন্ডিসাইটিস হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ব্যথানাশক ঔষধ, এ্যান্টাসিডস বা গরম প্যাড ব্যবহার করা যাবে না, এতে এপেন্ডিক্স ফেটে মারাত্মক বিপদ হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *