Categories
রোগের লক্ষন ও প্রতিকার

হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে সুগার মারাত্মক কমে যাওয়ার লক্ষণ

সাধারণত যারা ডায়াবেটিসে ভোগে তাদের রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার (sugar) পরিমাণ কমে গেলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। এর ফলে নানান উপসর্গ দেখা দেয় – যার বাড়াবাড়ি হলে জ্ঞান হারিয়ে কোমা-তে চলে যাওয়া – এমন কি তার থেকে মৃত্যুও হতে পারে। হাইপোগ্লাইসেমিয়া যদি বেশী হয়, তাহলে মস্তিষ্কের স্নায়ুপ্রণালীর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে; বারবার হাইপো হলে, অনেক সময় হাইপো অবস্থা সৃষ্টি হবার যেসব ইঙ্গিত আগে থেকে পাওয়া যায়, সেগুলি বুঝতে পারার ক্ষমতাও লোপ পেতে থাকে।

উপসর্গ

বিভিন্ন কারণে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে – ওষুধের প্রভাব, খাদ্য, এক্সারসাইজ, ইত্যাদি। হাইপোগ্লাইসেমিয়ার উপসর্গগুলি দেখা দেয় যখন রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ ৭০mg/dl বা তার কম হয়। উপসর্গগুলি সবার এক রকম নাও হতে পারে। মোটামুটিভাবে উপসর্গগুলি হলঃ

  • মাথা ঘোরা
  • হতচকিত অবস্থা
  • মাথা ধরা
  • খিদে পাওয়া
  • বুক ধড়ফড় করা
  • ঘামা
  • ক্লান্তি বোধ
  • শরীর কাঁপতে থাকা
  • ভয়

এগুলি উপেক্ষা করলে মনোসংযোগের ক্ষমতা হারানো, জিভ এবং মুখ অসার হয়ে যাওয়া , জ্ঞান হারানো বা কোমাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কেন হাইপো হয়

এর একাধিক কারণ থাকে – সবসময়ে সেগুলি ধরতেও পারা যায় না। বেশী ওষুধ নেওয়া বা নিতে ভুলে যাওয়া, সময়মত খাবার না খাওয়া, কম খাবার খাওয়া, নিয়মের বাইরে বেশী এক্সারসাইজ করা, উষ্ণ আবহাওয়া, বেশী মদ্যপান করা – ইত্যাদি নানা করণে হাইপো হতে পারে।

ডায়াবিটিসকে কব্জা করে রাখতে ইনসুলিন ব্যবহার করা হয়, কিন্তু হাইপো হবার একটা কারণ অত্যাধিক ইনসুলিন নিয়ে ফেলা। ইনসুলিনের ডোজ ঠিকমত নির্ণয় করা সহজ কাজ নয়। তার একটা কারণ, খাওয়াদাওয়ার পরিমাণ, কি ধরণের খাবার, কতটা এক্সারসাইজ করা হচ্ছে – ইত্যাদির উপর নির্ভর করে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ। মদ্যপান রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমায়। গর্ভধারণ করলে বা স্তন্যদানকালে রক্তে গ্লুকোজের পারিমাণ কমে।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার চিকিৎসা

যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের রক্তে গ্লুকোজ-এর পরিমাণ নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। যাদের শর্করা-য়ুক্ত খাবার খাওয়ার পরে রক্তে গ্লকোজের পরিমাণ কমে তারা রি-অ্যাক্টিভ হহাইপোগ্লাইসেমিয়াতে ভুগছে। এক্ষেত্রে চিনি-যুক্ত খাবার না খাওয়া এবং পরিমাণে অল্পকরে খাবার, কিন্তু ঘন ঘন সেটা খাওয়া উচিত। যদি অনেক ক্ষণ অভুক্ত থাকার ফলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়, তাহলে ঘুমোতে যাবার আগে, প্রোটিন-যুক্ত কিছু খাবার খাওয়া উচিত। যদি ডাক্তার মনে করেন যে, ইনসুলিন বেশী নেওয়া হচ্ছে এবং সেইজন্যেই হাইপো হচ্ছে – সেক্ষেত্রে তার ডোজ কমিয়ে হাইপো হবার সম্ভবনা কমানো যায়।

এছাড়া , হাইপো হচ্ছে বুঝতে পারলে, দু-তিনটে গ্লুকোজ ট্যাবলেট খেলে, বা গ্লুকোজ জেল খেলে উপকার পাওয়া যায়। অনেক সময় আধ-কাপ ফলের রস, এক চামচ চিনি বা সিরাপ, আধ-কাপ কোকাকোলা খেলে হাইপো অবস্থা এড়ানো যায়।

মিষ্টিযুক্ত খাবার খাওয়ার মিনিট পনেরো পরে, রক্তে কতটা শর্করা আছে দেখা উচিত। তখনো 70mg/dl (মিলিগ্রাম/ ডেসিলিটার)-এর কম থাকলে, আরও খাবার খেতে হবে। সবসময়েই হাইপো ঘটলে সময়, সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলী, রক্তে শর্করার পরিমাণ ইত্যাদি একটা নোটবিতে টুকে রাখা উচিত। পরে এটি ডাক্তারাকে দেখিয়ে তাঁর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

অনেক সময়ে হাইপো-র ফলে সংজ্ঞা হারানো একটা সম্ভাবনা। সংজ্ঞা হারালে রোগীকে গ্লুকাগন ইঞ্জেকশন দেওয়া দরকার। ডায়াবেটিস রোগীর বাড়ির কেউ যাতে এটি দিতে পারেন, সেটা দেখা দরকার।

হাইপো অবস্থা এড়ানোর উপায়

যারা ডায়াবেটিসে ভুগছে তারা হাইপো অবস্থা এড়াতে পারে, যদি –

  • ডাক্তারের নির্দেশমত এবং ঠিক সময় মত খাওয়াদাওয়া করে
  • খাবার পরে ডাক্তারের নির্দেশমাত এক্সারসাইজ করে।
  • সঠিক পরিমাণ ইনসুলিন এবং ডায়াবেটিসের অন্য ওষুধ নেয়
  • ওষুধের তীব্রতা কখন সবচেয়ে বেশী থাকে – সেই সময়টা জেনে – সেই সময়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকে।
  • পকেটে সবসময়ে চিনির খাবার রাখে
  • রক্তে শর্করার পরিমাণ ডাক্তারের নির্দেশমত নিয়মিত মেপে দেখে এবং সেটি নির্দিষ্ট সীমারেখার বাইরে যাবার আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
Categories
রোগের লক্ষন ও প্রতিকার

ভাইরাল জ্বর

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র রায় বলেন, ভাইরাল জ্বরে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। অন্যান্য ভাইরাল জ্বরের মতো এটিও আপনা-আপনি সাধারণত ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। ভাইরাসজনিত জ্বরের অন্যান্য রোগের মতো এরও কোনো প্রতিষেধক নেই, টিকাও নেই। লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা করতে হয়।

ভাইরাল জ্বরের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো শরীরের পেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা, চোখ লাল হওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া ইত্যাদি। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বাচ্চার মুখ লাল হয়ে যায়, গা প্রচণ্ড গরম থাকে, মাথা ব্যথা করে, সঙ্গে থাকে সর্দি ও কাশি। সব সময় মাথা ভারী মনে হয়। এতে বাচ্চারা দুর্বল হয়ে পড়ে।

কীভাবে বুঝবেন ভাইরাল জ্বর

* হঠাৎ জ্বর আসা ও ৭-৮ দিন ধরে চলতে থাকে

* শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। ১০২-১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর হয়

* জ্বরের সঙ্গে প্রচণ্ড মাথাব্যথা, গা ম্যাজম্যাজ করা

* বেশির ভাগ সময় জ্বরের সঙ্গে সর্দি-কাশি থাকে

* বিশেষ ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে পেট ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে

* গায়ে, হাত-পায়ে অসহ্য ব্যথা হয়

* মুখে বিস্বাদ, বমি বমি ভাব, ক্ষুধামান্দ্য হয়

* গলায় প্রচুর ব্যথা করতে পারে

* জ্বরের মাত্রা খুব বেশি হলে বাচ্চারা অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে

চিকিত্সা ও পরামর্শ

* জ্বর থাকলে জ্বর কমানোর ও শরীরের ব্যথা কমার ওষুধ দেওয়া হয়।

* জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখতে গা-হাত-পা স্পঞ্জ করতে হবে এবং মাথা ধুয়ে বাতাস করে জ্বর কমাতে হবে। জ্বর কখনোই বাড়তে দেওয়া যাবে না।

* খাওয়া-দাওয়া স্বাভাবিক রাখতে হবে। পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। কারণ শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ঠিক রাখে পুষ্টিকর খাবার।

* পরে অন্য উপসর্গ দেখা দিলে সেই অনুযায়ী রোগীকে চিকিৎসকের পরামর্শমতো চিকিৎসা দেওয়া উচিত।

* বিশ্রামে থাকতে হবে। বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। প্রচুর ফলমূল খেতে হবে। বাইরের খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

* সর্দি-কাশি, গলাব্যথা হলে সকাল-বিকেল চা বা কফি খাওয়া যেতে পারে।

* চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না।

সাবধানতা

ভাইরাসের কারণে জ্বর থেকে শরীরে দেখা দিতে পারে নানা সমস্যা। যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন না করলে ভাইরাল জ্বর রূপ নেয় নানা জটিল রোগে যেমন: নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, ডায়রিয়া, সাইনোসাইটিস ইত্যাদি। এমনকি মস্তিষ্কেরও ক্ষতি করতে পারে।

* মাম্পস, টিটেনাস, চিকেন পক্স, পোলিও, হেপাটাইটিস, স্মল পক্স, টিকা শিশুদের যথা সময়ে দিতে হবে

* বাড়িতে পোষা কুকুরকে নিয়মিত র্যা বিস ভ্যাকসিন দিতে হবে

* ভাইরাল জ্বর হলে রোগীকে একটু আলাদা রাখতে হবে

* জ্বর হওয়ামাত্র চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে

জ্বর হলেই কি অ্যান্টিবায়োটিক?

* কোনো সুনির্দিষ্ট রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনোসিসে পৌঁছার আগেই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করে দিলে প্রকৃত রোগটি অনেক সময় ধরা পড়ে না। সুচিকিত্সা পাওয়া অসম্ভব হয়ে যায়।

* জ্বর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যান্টিবায়োটিক দিলে বাচ্চাদের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার সুযোগও হয় না। তাই অন্তত দুই দিন না গেলে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়। মনে রাখবেন মেনিনজাইটিস বা সেপটিসেমিয়া ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে দেরি করে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করলে কোনো অসুবিধা নেই।

Categories
রোগের লক্ষন ও প্রতিকার

স্ট্রোকের এই ১৩টি লক্ষণ কখনোই অগ্রাহ্য করা উচিত নয়

মস্তিষ্কের ভেতরে রক্তের শিরায় রক্ত জমাট বাধার ফলে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে স্ট্রোক হয়। এ থেকে ব্রেন ড্যামেজ, প্যারালাইসিস এবং মৃত্যুও হতে পারে। সুতরাং স্ট্রোক গুরুতর একটি স্বাস্থ্য সমস্যা। আর এমনটা ঘটলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতাল ও ডাক্তারের কাছে নেওয়াও জরুরি। সুতরাং স্ট্রোকের প্রাথমিক এই ১৩টি লক্ষণ কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করা যাবেন না।

১. মুখের অর্ধেক অসাড় হয়ে পড়া

আপনি যদি হঠাৎ করেই হাসার সময় মুখের অর্ধেক নাড়াতে না পারেন বা মুখের অর্ধেক পুরোপুরি অসাড় হয়ে পড়ে তাহলে তা স্ট্রোকের স্পষ্ট একটি লক্ষণ। এমনটা ঘটে যখন আপনার মুখের মাংসপেশিতে রক্ত সরবরাহকারী স্নায়ুগুলো অক্সিজেন সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২. একটি বাহুতে দুর্বলতা

স্ট্রোকের আরেকটি স্পষ্ট লক্ষণ হলো কোনো একটি বাহুতে এমন দুর্বলতা বা অসাড়তা যে আপনি তা মাথার ওপর টেনে তুলতে পারছেন না।

৩. কথা বলায় অস্পষ্টতা

আপনি যদি হঠাৎ করেই কথা বলার সময় অস্পষ্ট আওয়াজ করতে থাকেন তাহলে তা স্ট্রোকের লক্ষণ। এমনটা হচ্ছে আপনার মস্তিষ্কের কথা বলা এবং যোগাযোগের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে। এমনটা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখান। আর নয়তো কথা বলার শক্তি হারাবেন চিরতরে।

৪. দেহের একপাশে দুর্বলতা বা প্যারালাইসিস

দেহের কিছু অংশ বা অর্ধেকটাজুড়ে দুর্বলতা বা প্যারালাইসিস এর মধ্য দিয়েও স্ট্রোকের লক্ষণ ফুটে ওঠে। এমন লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই হাসাতাল ও ডাক্তারে কাছে যেতে হবে। আর নয়তো স্থায়ীভাবেই দেহের অর্ধেকটা প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে পড়বে এবং অচল হয়ে যাবে।

৫. পিন বা সুচ ফোটার অনুভূতি

দীর্ঘক্ষণ বসে বা শুয়ে থাকার কারণে বাহুতে এবং পায়ে যদি সুচ বা পিন ফোটার অনুভূতি হয় তাহলে তা স্ট্রোকের লক্ষণ নয়। কিন্তু আপনি যদি আগে কখনো সুচ বা পিন ফোটার অনুভূতি হয়নি এমন কোনো তৎপরতার মাঝখানে হঠাৎ করেই পিন বা সুচ ফোটার অনুভূতি পান তাহলে তা নিশ্চিতভাবেই স্ট্রোকের লক্ষণ।

৬. ঝাপসা দৃষ্টি

স্ট্রোকের আরেকটি লক্ষণ হলো আপনার কোনো একটি চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা। মস্তিষ্কের যে অংশ আপনার দৃষ্টি সম্বন্ধীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে সে অংশে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যাওয়ার ফলে এমনটা ঘটতে পারে।

৭. হঠাৎ ঝিমুনি

এটি স্ট্রোকের আরেকটি লক্ষণ। মস্তিষ্কের একটি অংশে রক্তসরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে এটা ঘটে।

৮. হাঁটা-চলায় অস্বাভাবিকতা

আপনি যদি আগে ঘটেনি এমনভাবে হঠাৎ করেই হাঁটা-চলায় অক্ষম হয়ে পড়েন তাহলে বুঝতে হবে আপনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন।

৯. তীব্র মাথাব্যথা

আপনি যদি আগের যে কোনো মাথা ব্যথার তুলনায় অনেক বেশি তীব্র মাথা ব্যথায় আক্রান্ত হন তাহলে বুঝতে হবে আপনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। আর এই ব্যথা যে কোনো ব্যথার চেয়ে তীব্র হওয়ার কারণ এটি হলো মৃত্যুর আগে আপনার মস্তিষ্কের সাহাজ্য চেয়ে কান্না করার মতো।

১০. স্মৃতি হারানো

মস্তিষ্কের যে অংশ স্মৃতি সংরক্ষণের কাজ করে সে অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

১১. আচরণগত পরিবর্তন

মস্তিষ্কই যেহেতু আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে সেহেতু স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে লোকের অস্বাভাবিক রাগ, উদ্বেগ এবং ভ্যাবাচেকা খাওযার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এমনকি স্ট্রোক থেকে বেঁচে যাওয়ার পরও এমন সব সমস্যায় স্থায়ীভাবে আক্রান্ত হতে পারেন।

১২. লালা গেলায় সমস্যা

আপনি হয়তো বুঝতে পারেন না।  কিন্তু আপনি প্রতি ১৫-৩০ সেকেন্ড পরপর আপনার মুখের লালা গিলে ফেলেন। প্রকৃতপক্ষে একজন মানুষ প্রতি ২৪ ঘন্টায় ৬০০-৮০০ বার লালা গিলে ফেলেন। আর খাবারের সময় সচেতনভাবে গেলা তো আছেই। সুতরাং হঠাৎ করেই যদি আপনি লালা আর গিলতে না পারেন এবং তা মুখ বেয়ে পড়তে থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন।

১৩. মাংসপেশিতে খিল ধরা

আপনার মাংসপেশির স্নায়ুগুলোর রক্ত সরবরাহ যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে আপনার দেহের এক বা একাধিক জায়গায় মাংসপেশি শক্ত হয়ে আসবে। দেহের যে কোনো অর্ধেক অংশেই সাধারণত এমনটা ঘটে।

ভাইরাল ফিভার বা ভাইরাস জ্বর বছরের যেকোনো সময় হতে পারে। তবে আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় এই রোগ বেশি হতে দেখা যায়। এটি সাধারণত ছোঁয়াচে হয়ে থাকে। ক্রমে এই ভাইরাসজনিত রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একসঙ্গে পরিবারের অনেকেই আক্রান্ত হতে পারে। কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলে এমন ভাইরাল জ্বর পরিবারের সবাইকে আক্রান্ত করতে পারে না। জ্বরের শুরুতে এর প্রকৃতি নিরূপণ করা না গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জ্বরের ধরন ও বিভিন্ন উপসর্গ দেখেই ভাইরাল জ্বর নির্ণয় করা যায়।

Categories
রোগের লক্ষন ও প্রতিকার

হার্ট এটাকের কারণ ও সতর্কতা

হৃৎপিন্ড সম্পূর্ণ শরীরে রক্ত সরবরাহের কাজ করে থাকে। করোনারি আর্টারি নামে হৃৎপিন্ডের গায়ে ছোট দুটি ধমনী আছে। এই করোনারি আর্টারিতে কোলস্টেরল জমে ধমনীর রক্ত প্রবাহে বাধা সৃষ্টির ফলে হৃদযন্ত্রে রক্তাল্পতা জনিত কারণে অক্সিজেনের সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে হার্ট এ্যাটাক (মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কসন) হয়। প্রতি মিনিটে প্রায় ৭২ বার স্পন্দনের মাধ্যমে হৃৎপিন্ড সারাদেহে পাম্পের মত রক্ত সরবরাহ করে। এই হৃদযন্ত্রের কাজ বাধাগ্রস্থ হলে সেটা সারা দেহের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। হার্ট এটাকে বুকে প্রচন্ড ব্যাথার অনুভূতি হয় এবং এই ব্যাথা মোটামুটিভাবে ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগী হাসপাতালে পৌছার পূর্বেই মৃত্যুবরন করেন। হার্ট এ্যাটাকের সময় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে রোগীর মৃত্যু হতে পারে। আবার অনেক সময় রোগী বুকে ব্যাথা অনুভব করেন এবং সেটা কিছু সময় পরে সেটা সেরে যেতে পারে।

হার্ট এটাকের কারন

স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা সম্পৃক্ত চর্বি হৃদপিন্ডের করোনারি আর্টারিতে জমে এবং ধমনী প্রাচীর মোটা হয়ে সহজে রক্ত প্রবাহিত হতে পারে না এবং রক্ত জমাট বেঁধে যায়। এটাই হার্ট এটাকের কারন।

হার্ট অ্যাটাক কাদের হতে পারে

কিছু বিষয় আছে যেগুলো নিয়ন্ত্রন করা যায় না আবার কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো নিয়ন্ত্রন করা যায় না। সাধারনত যেসকল কারনে হার্ট অ্যাটাক হতে পারেঃ

  • হার্ট এটাক সব বয়সে একরকমভাবে হয় না। সাধারনত মধ্যবয়সে কিংবা বৃদ্ধ বয়সে এ রোগটি বেশি হতে পারে।
  • সাধারনত মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের অনেক বেশি হয়।
  • বংশে কারও হার্ট এটাক হয়ে থাকলে হার্ট এটাকের ঝুকি অনেক বেশি থাকে।
  • ধুমপান, মদ্যপান ইত্যাদি কারনে হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি অনেক বেড়ে যায়।
  • ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাইপার লিপিডেমিয়া ইত্যাদি রোগের কারনে হার্ট এটাক হতে পারে।
  • শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে মুটিয়ে যাওয়া বা স্থূলতা হার্ট এটাকের একটি কারন।
  • অধিক হারে চর্বি জাতীয় খাদ্য গ্রহন করলে এবং শাক সবজি ও আঁশ জাতীয় খাবার কম খেলে।
  • অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা অশান্তির ফলে।
  • জন্মনিয়ন্ত্রক পিল বা অন্য কোন হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ সেবনের ফলে।

কখন হতে পারে?

হার্ট এটাকের কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। যেমন- এটি রাতে ঘুমের মধ্যে হতে পারে, বিশ্রামের সময় হতে পারে, ভারী শারীরিক পরিশ্রমের সময় হতে পারে আবার মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে হতে পারে ইত্যাদি। শতকরা ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক হয় এবং রোগী আর ঘুম থেকে জাগে না। হার্ট এটাক যেকোন সময়ই হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ বা উপসর্গসমূহ

  • নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা অথবা শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
  • বমি বমি ভাব অথবা বমি হতে পারে।
  • বুকে মারাত্মক তীব্র ব্যথা হতে পারে।
  • বুকে চাপ অনুভুত হওয়া, যন্ত্রণা হওয়া কিংবা ভারী ভারী লাগা।
  • বিষম খাওয়া।
  • শরীরে প্রচুর পরিমানে ঘাম হতে পারে।
  • খাবার হজমে সমস্যা হবে এবং পেটের উপরের অংশে জ্বালাপোড়া করতে পারে।
  • চোখে ঝাপসা দেখা, অন্ধকার দেখা ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে।
  • হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হলে রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।

হার্ট এটাক হলে করনীয়

  • আক্রান্ত ব্যক্তিকে এক মুহুর্ত দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
  • কোনভাবেই রোগী নিজে পায়ে হেঁটে কিংবা নিজেই গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেবেন না।
  • হার্ট এটাক হয়েছে নিশ্চিত হলে, রক্ত জমাট বাঁধা বন্ধ করতে রোগীকে তাৎক্ষণিক এসপিরিন বা ওয়ারফেরিন জাতীয় ওষুধ খাওয়ানো যেতে পারে।
  • জিহবার নিচে নাইট্রোগ্লিসারিন স্প্রে দিতে হবে।
  • রোগীকে মানসিকভাবে আশ্বস্ত করতে হবে।
  • কমপক্ষে দুইজন হাসপাতালে রোগীর সাথে যাবেন। এতে রোগ সনাক্ত ও চিকিৎসা শুরুর সময় কিছুটা কমানো যায়।

হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে করনীয়

  • মানসিক অবসাদ বা দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে।
  • নিয়মিত ব্লাড প্রেসার পরিমাপের মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে।
  • নিয়মিতভাবে ডায়াবেটিস পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রন করতে হবে।
  • ধুমপান, মদ্যপান ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • মোটা হওয়া বা স্থূলতা নিয়ন্ত্রন করতে হবে।
  • চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়া কমাতে হবে এবং রক্তে কোলেস্টোরলের মাত্রা কমাতে হবে।
  • শাকসবজি, ফল বেশি করে খেতে হবে।
  • প্রতিদিন নিয়মিতভাবে হাঁটা, দৌড়ানো কিংবা কোন শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।

হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা

  • হার্ট এটাকের চিকিৎসায় রোগীকে দ্রুত নিকটস্ত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এরকম ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পূর্বে কিংবা নেওয়ার মধ্যবর্তী রাস্তায় পর্যাপ্ত পরিমানে আলো বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে। রোগীর জিহবার নিচে একটি নাইট্রেট ট্যাবলেট দিতে হবে।
  • হাসপাতাল নির্বাচনের ক্ষেত্রে, হৃদরোগের চিকিৎসা সুবিধা সংবলিত হাসপাতাল হলে উত্তম। হাসপাতালে ভর্তি করে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে ধারাবাহিক চিকিৎসা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
  • হাসপাতালে নেবার পর চিকিৎসক প্রয়োজন অনুসারে চিকিৎসা শুরু করবেন। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে রোগীর ECG করতে হতে পারে, অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে আবার ইনত্রা ভেনাস ফ্লুইড কিংবা নাইট্রোগ্লিসারিন দিতে পারেন।
  • প্রথমে এনজিওগ্রাম করে ব্লকের পরিমান নির্ণয় করতে হবে। যদি ব্লক বেশি হয় এবং ওষুধে সমাধান হবে না বলে মনে হয়, তবে এনজিওপ্লাস্ট করতে হতে পারে। এক্ষেত্রে সার্জন ছোট হয়ে যাওয়া ধমনীতে প্রয়োজন অনুসারে কয়েকটি মাইক্রো রিং পরিয়ে দিবেন।
  • এরপরেও আবার হার্ট এটাক হলে, চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে ওপেন হার্ট সার্জারি বা বাইপাস সার্জারি করতে পারেন। এক্ষেত্রে সার্জন পা থেকে একটি শিরা কেটে নিয়ে সেটি দিয়ে ধমনীর সমস্যাযুক্ত অংশ দিয়ে স্বাভাবিক রক্ত প্রবাহের একটি বাইপাস রাস্তা তৈরি করে দিতে পারেন।

শেষ কথা

জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে, নিয়মিত রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রন, প্রতিদিন ব্যায়াম, ধূমপান কিংবা মদ্যপানের মত বাজে অভ্যাস পরিত্যাগ, বাড়তি লবণ না খাওয়া, তেল বা চর্বি জাতীয় খাবার কম খাওয়া, মিষ্টি কম খাওয়া, শাক সবজি ও ফলমূল বেশি করে খাওয়া এবং মানসিক দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হার্ট এটাকের ঝুঁকি থেকে অনেকটা নিরাপদে থাকা যাবে। আধুনিক বিশ্বে অপরিণত বয়সে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান একটি কারণ হার্ট এটাক। হার্ট এটাকের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কারণকে দায়ী করা যায় না, তাই জীবনযাপনে পরিবর্তন এনে প্রতিরোধের মাধ্যমে সুস্থ্যভাবে বেঁচে থাকতে হবে। সতর্ক জীবনযাপনের পরেও হার্ট এটাক হলে, তার মাত্রা ও তীব্রতা অনেক কম হয়।

Categories
রোগের লক্ষন ও প্রতিকার

নিপাহ ভাইরাস কী?

নিপাহ ভাইরাস

নিপাহ একটি ভাইরাসজনিত (নিপাহ ভাইরাস) সংক্রামক রোগ। এই ভাইরাসটি সাধারণত বাদুড় থেকে মানুষে সংক্রামিত হয়। সাধারণত ফল আহারী বাদুড় এই ভাইরাসের প্রধান বাহক।

তবে, যেহেতু আমাদের দেশে শীতকালে খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয় এবং রাতের বেলায় বাদুড় কখনো কখনো খেজুরের রস পান করার জন্য খেজুর গাছের কাটা (ছিলানো) অংশে বা বাঁশের পাইপে মুখ দেয়, তাই এ সময় এই রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশী থাকে।

নিপাহ রোগের কোন টিকা এবং সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। সতর্কতা এবং সচেতনতাই এ রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায়।

এ রোগের লক্ষণ এবং প্রতিরোধের জন্য করণীয় সংক্রান্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক পরামর্শসমূহ নিম্নরূপঃ

নিপাহ রোগের প্রধান লক্ষণসমূহঃ

  • জ্বরসহ মাথা ব্যথা
  • মাংশ পেশীতে ব্যথা
  • খিঁচুনি আসা
  • প্রলাপ বকা
  • অজ্ঞান হওয়া
  • কোন কোন ক্ষেত্রে (তীব্র) শ্বাসকষ্ট হওয়া

 নিপাহ রোগ প্রতিরোধে করণীয়ঃ

  • খেজুরের কাঁচা রস খাবেন না
  • কোন ধরনের আংশিক খাওয়া ফল খাবেন না
  • ফলমূল পরিস্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে খাবেন
  • নিপাহ রোগের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে প্রেরণ করুন
  • আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসার পর সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলুন

খেজুড়ের গুড়, রান্না করা খেজুরের রসের পায়েস বা রান্না করা শা

Categories
রোগের লক্ষন ও প্রতিকার

পেটের আলসারের লক্ষণ – কারণ ও প্রতিকার

পেটের আলসার কনটেন্টটিতে পেটের আলসার কী, লক্ষণ, উপসর্গ, চিকিৎসা, পরীক্ষা নিরীক্ষা, বাড়তি সতর্কতা, প্রতিরোধ সর্ম্পকে বর্ণনা করা হয়েছে।

পেটের আলসার একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। সচেতন হলে এই রোগ অনেকখানি প্রতিরোধ করা সম্ভব। এছাড়া বর্তমানে সফলভাবে এই রোগের চিকিৎসা করা হয়ে থাকে।

 পেটের/পাকস্থলীর/ক্ষুদ্রান্তের আলসার কী  

পাকস্থলীর আলসার হলো একধরনের ঘা যা পাকস্থলীর ভিতরের আবরণ, উপরের ক্ষুদ্রান্ত অথবা খাদ্যনালীতে সৃষ্টি হয়ে থাকে। পাকস্থলীর আলসারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো পেট ব্যথা।

পেটের/পাকস্থলীর ক্ষুদ্রান্ত্র আলসার হয়েছে কি করে বুঝবেন

  • রোগের সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ হলো তীব্র ব্যথা।
  • নাভি থেকে শুরু করে বুকের হাড় পর্যন্ত এই ব্যথা অনুভূত হয়।
  • ব্যথা কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
  • পাকস্থলী খালি থাকলে ব্যথা আরো বেশি অনুভূত হয়।
  • খাবার খেলে বা এসিডের ওষুধ খাওয়ার ফলে সাময়িকভাবে ব্যথার উপশম হয়। আবার ক্ষুদ্রান্ত্র আলসার বা ঘাতে খেলেও ব্যথা বাড়ে।
  • ব্যথা চলে গিয়ে  কিছু দিন বা কয়েক সপ্তাহের জন্য আবার ফিরে আসে।

অন্যান্য লক্ষণ ও উপসর্গ

  • লাল অথবা কালো রংয়ের রক্ত বমি।
  • পায়খানার সাথে গাঢ় রংয়ের রক্ত যাওয়া অথবা পায়খানার  রং কালো অথবা আলকাতরার রংয়ের মতো হওয়া।
  • বমি বমি ভাব অথবা বমি হওয়া।
  • হঠাৎ করে শরীরের ওজন কমে যাওয়া।
  • খাবারে রুচির পরিবর্তন হওয়া।

প্রশ্ন.১.পেটের/পাকস্থলীর/ক্ষুদ্রান্তের আলসার কেন হয়?

উত্তর.একধরনের জীবাণু (ব্যাকটেরিয়া হেলিকোব্যাক্টার) এই রোগের কারণ। এছাড়া খাবারে অতিরিক্ত তেল,মসলার ব্যবহার, নিয়মিত ব্যথার ওষুধ সেবন,অতিরিক্ত চাপ এবং ধূমপান করলেও পাকস্থলীর আলসার হতে পারে।

প্রশ্ন.২.পাকস্থলীর আলসার থেকে কি ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে?

উত্তর.পাকস্থলীর আলসার থেকে যে ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে তা হলো: পাকস্থলী/ক্ষুদ্রান্ত ফুটো হয়ে যাওয়া ও তার থেকে পেটের ভিতরে সংক্রমণ হয়ে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

প্রশ্ন.৩.পাকস্থলীর আলসার কাদের বেশী হয়?

উত্তর.যারা : ১.অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বা বেশী বেশী ব্যথা কমানোর ঔষধ খান,২.অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার খান,৩.ধূমপান করেন,  নেশা জাতীয় জিনিস সেবন করেন, তারা পাকস্থলীর আলসারের সমস্যায় বেশী ভুগে থাকেন।

Categories
রোগের লক্ষন ও প্রতিকার

গ্যাস্টিক এর লক্ষন ও করণীয়

পেটের ওপরের দিকে সারা দিন অল্প অল্প ব্যথা থেকে শুরু, হঠাৎ তীব্র ব্যথা আর বদহজম বা খাওয়ার পরে—সবই পেপটিক আলসারের ব্যথা হিসেবে পরিচিত। সাধারণত লোকজন গ্যাস্ট্রিক বা আলসার বলতে যা বুঝিয়ে থাকেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে পেপটিক আলসার।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ‘যাঁরা নিয়মিত খাবার গ্রহণ করেন না কিংবা দীর্ঘ সময় উপোস থাকেন, তাঁদের পেপটিক আলসার দেখা দিতে পারে। পেপটিক আলসার যে শুধু পাকস্থলীতেই হয়ে থাকে তা কিন্তু নয়, বরং এটি পৌষ্টিকতন্ত্রের যেকোনো অংশেই হতে পারে।

কেন হয়?

প্রধানত পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি হওয়ায় এ সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত অ্যাসিড পাকস্থলীর মিউকোসার পর্দা নষ্ট করে পাকস্থলীর সংস্পর্শে আসে এবং প্রদাহ তৈরি করতে পারে। আর হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি নামক ব্যাকটেরিয়াও মিকোসাল পর্দা নষ্ট করে দেয়। অ্যাসিডকে পাকস্থলীর সংস্পর্শে এসে প্রদাহের সৃষ্টি করে। এ ছাড়া কারও পৌষ্টিকতন্ত্র থেকে যদি বেশি পরিমাণে অ্যাসিড এবং প্রোটিন পরিপাককারী একধরনের এনজাইম (পেপসিন নামে পরিচিত) নিঃসৃত হতে থাকে, তবে এটি হতে পারে। আবার জন্মগতভাবে কারও পৌষ্টিকতন্ত্রের গঠনগত কাঠামো দুর্বল থাকে, তাহলেও পেপটিক আলসার হতে পারে।

কী কারণে পাকস্থলীতে বেশি অ্যাসিড তৈরি হতে পারে?

ব্যথানাশক ওষুধের কারণে বেশি অ্যাসিড তৈরি হতে পারে। অনিদ্রা, অতিরিক্ত টেনশন, বেশি তেলে ভাজাপোড়া খাবার, ধূমপান ইত্যাদিও বাড়তি অ্যাসিড তৈরি করে।

যা দেখে বুঝবেন

. পেটের উপরিভাগে ব্যথা, জ্বালাপোড়া হওয়া।

. খাওয়ার ঠিক পরপর ব্যথা বাড়ে (গ্যাস্ট্রিক আলসার)।

. খালি পেটে ব্যথা বাড়া (ডিওডেনাল আলসার)।

. ঢেঁকুর ওঠা।

. বদহজম হওয়া।

প্রতিরোধ

নিয়মিত খাবার গ্রহণ, ভাজাপোড়া খাবার পরিহার, দুশ্চিন্তা পরিহার, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান বন্ধ করতে হবে। ব্যথানাশক ওষুধ অর্থাৎ অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ সেবন থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকতে হবে।

চিকিৎসা

পেপটিক আলসারের রোগীরা সাধারণত অ্যান্টাসিড এবং এজাতীয় ওষুধ সেবনে উপকৃত হন।

জীবাণুজনিত কারণে যদি এ রোগ হয়ে থাকে, তবে বিভিন্ন ওষুধের সমন্বয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

তবে দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ সেবনের পরও যদি রোগী ভালো না হন, কিছু খেলে যদি বমি হয়ে যায় অর্থাৎ পৌষ্টিক নালির কোনো অংশ যদি সরু হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে অপারেশন করিয়ে রোগী উপকৃত হতে পারেন।

সময়মতো চিকিৎসা না করালে

. পাকস্থলী ফুটো হয়ে যেতে পারে।

. রক্তবমি হতে পারে।

. কালো পায়খানা হতে পারে।

. রক্তশূন্যতা হতে পারে।

. ক্যানসারও হতে পারে (কদাচিৎ)।

. পৌষ্টিক নালির পথ সরু হওয়া এবং রোগীর বারবার বমি হতে পারে।

ঝাল খেলে কি পেপটিক আলসার হয়?

এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ চিকিৎসাবিজ্ঞানে মেলেনি।

বেশি বেশি পানি পান করলে কি পেপটিক আলসার ভালো হয়ে যায়?

বেশি পানি পান করলে এই রোগ হবে না বা ভালো হয়ে যায় এমন কোনো কথা নেই; বরং হিতে বিপরীত হতে পারে। পরিমিত পানি পান করাই উত্তম।

হঠাৎ বা গভীর রাতে পেটে ব্যথার কারণে রোগীর ঘুম ভেঙে গেলে কী করবেন?

কিছু খেলে ব্যথা কমে যায় বা অ্যান্টাসিড সিরাপ খুব ভালো কাজ দেয়। সমস্যা বেশি হলে হাসপাতালে নিতে হবে।

কাজেই যাঁরা দীর্ঘমেয়াদি পেপটিক আলসারে ভুগছেন, তাঁদের উচিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া, পেপটিক আলসারজনিত জটিলতা আগে থেকেই শনাক্ত করা এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া।

Categories
রোগের লক্ষন ও প্রতিকার

থাইরয়েডর লক্ষন ও সম্ভাব্য চিকিৎসা

বর্তমানে পৃথিবীতে থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক। আমরা অনেকে এই রোগের নাম শুনলেও বা আশেপাশে আক্রান্ত রোগী দেখলে কিংবা নিজে আক্রান্ত হলেও আমরা এই রোগ সম্পর্কে অনেকেই খুব একটা জানিনা। চলুন তাহলে এই সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক ঃ

থাইরয়েড কি?

থাইরয়েড হল আমাদের একটি গ্রন্থি যা আমাদের গলার সামনের দিকে অবস্থিত। এই গ্রন্থি থেকে কিছু প্রয়োজনীয় হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন আমাদের বিপাক সহ আরো বিভিন্ন কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই হরমোন তৈরির জন্য এই গ্রন্থিটির প্রয়োজনীয় পরমাণে আয়োডিনের দরকার হয়। উক্ত হরমোন আমাদের বিপাক ক্রিয়া সহ বিভিন্ন শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

থাইরয়েড গ্রন্থি

থাইরয়েড গ্রন্থি সাধারণত দুই ধরণের হরমোন নিঃসরণ করে।

  1. ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন(T3)
  2. থাইরক্সিন(T4)

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে জন্মের সময় এই গ্রন্থি ঠিকভাবে তৈরি না হলে কিংবা প্রয়োজনমত হরমোন তৈরি করতে না পারলে বাচ্চাদের শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

আমাদের শরীরে যতটুকু হরমোন প্রয়োজন তার চেয়ে কম কিংবা বেশি পরিমাণে এই হরমোন তৈরি হলে তখন নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়। প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণে এই হরমোন তৈরি হলে হাইপোথাইরয়ডিজম হতে পারে। আবার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরিমাণে এই হরমোন উৎপন্ন হলে হাইপারথাইরয়ডিজম হতে পারে। উভয়ই আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

এছাড়াও উক্ত গ্রন্থিতে আরো বিভিন্ন রকমের রোগ হতে পারে। সাধারণত বেশি হয় এমন কিছু রোগ নিয়ে আলোচনা করা যাকঃ

  • হাইপোথাইরয়ডিজম(Hypothyroidism)
  • হাইপারথাইরয়ডিজম(Hyperthyroidism)
  • গয়েটার(Goiter)
  • নডিউল(Nodule)
  • থাইরয়েড ক্যান্সার(Thyroid Cancer)
  • গ্রেভস ডিজিজ(Graves’ disease)

হাইপোথাইরয়ডিজম(Hypothyroidism ) ঃ

থাইরয়েড গ্রন্থি যদি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন উৎপাদন করে তখন হাইপোথাইরয়ডিজম হবার সম্ভাবনা আছে। যদিও অনেক সময় এর চোখে পড়ার মত লক্ষণ দেখা যায়না, যার ফলে অনেকে বুঝতেই পারেন না তারা হাইপোথাইরয়ডিজম এ আক্রান্ত।

তবে হাইপোথাইরয়ডিজম হলে সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায় তা হলঃ

  • ক্লান্তি কিংবা অবসাদ অনুভব করা
  • কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে না পারা।
  • শুষ্ক ত্বক
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • অল্পতেই শীত শীত লাগবে
  • পেশী এবং বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যাথা অনুভূত হবে।
  • বিষণ্ণতা থাকবে
  • মহিলাদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাবের সময় অতিরিক্ত পরিমাণ রক্তক্ষরণ হতে পারে।
  • পালস রেট কম থাকতে পারে স্বাভাবিক এর তুলনায়।

হাইপারথাইরয়ডিজম(Hyperthyroidism ) ঃ

এক্ষেত্রে হাইপারথাইরয়ডিজম এর উল্টো ঘটনা ঘটে। থাইরয়েড গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হরমোন উৎপাদন করলে হাইপারথাইরয়ডিজম হবার সম্ভাবনা থাকে।

থাইরয়েড গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি নামক এক গ্রন্থি। মস্তিষ্কের এই পিটুইটারি গ্রন্থি কে আবার নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস নামক অংশ। এই হাইপোথ্যালামাস থাইরয়েড রিলিজিং হরমোন(TRH) নামক এক হরমোন নির্গত করে। এই TRH হরমোন এর কাজ হল পিটুইটারি গ্রন্থি কে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন(TSH) নামক এক হরমোন নির্গত করার জন্য সংকেত পাঠানো। এই TSH হরমোন উক্ত গ্রন্থি কে থাইরয়েড হরমোন নির্গত করার জন্য সংকেত পাঠায়। বোঝা গেল তাহলে এই হরমোন উৎপাদন এর জন্য শুধুমাত্র থাইরয়েড গ্রন্থি দায়ী নয়। হাইপোথ্যালামাস, পিটুইটারি গ্রন্থি এবং থাইরয়েড গ্রন্থির মিলিত প্রচেষ্টায় হরমোন নির্গমণ কাজ সম্পন্ন হয়।

এখন উক্ত ৩ টি গ্রন্থির যে কোনো একটি বা একাধিক গ্রন্থি যদি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কাজ করে ফেলে তখন ফলাফল হিসেবে যতটুকু হরমোন দরকার তার চেয়ে বেশি পরিমাণ হরমোন উৎপন্ন হয়। আর তখনই  বাঁধে সমস্যা। যেটা হাইপারথাইরয়ডিজম নামে পরিচিত

হাইপারথাইরয়ডিজম হলে সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায়ঃ

  • অতিরিক্ত ঘাম
  • গরম সহ্য না করতে পারা
  • হজমে সমস্যা
  • দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ বেড়ে যাওয়া।
  • অস্থিরতা অনুভব করা।
  • ওজন কমে যাওয়া
  • পালস রেট বেড়ে যাওয়া
  • ঠিকমত ঘুম না হওয়া
  • চুল পাতলা এবং ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া
  • ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া
  • মহিলাদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব অনিয়মত কিংবা খুব অল্প পরিমাণে হওয়া।
  • বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে। খুব খারাপ অবস্থা হলে এবং হাইপারথাইরয়ডিজম এর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না নেয়া হলে থাইরয়েড স্টর্ম(thyroid storm) হতে পারে। এতে রোগীর রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, জ্বর আসতে পারে এবং হৃদস্পন্দন বন্ধ ও হয়ে যেতে পারে।

গয়েটার(Goitar) ঃ

এছাড়াও থাইরয়েড গ্রন্থিটিই বড় হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে একে গয়েটার(Goiter) বা গলগন্ড বলা হয়ে থাকে। যেহেতু গ্রন্থিটি হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন এর প্রয়োজন পড়ে। সেহেতু আয়োডিনের অভাব হলে গ্রন্থিটি হরমোন তৈরি করতে পারেনা ঠিকভাবে। তবুও এটি চেষ্টা করে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন তৈরি করতে। ফলস্বরূপ এটি নিজে বড় হয়ে যায় শরীরের হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে। এবং একটা সময় এটি আর পারেনা সেই স্বাভাবিক মাত্রায় হরমোন তৈরি করতে। ফলে হরমোন এর পরিমাণ কমে যায় প্রয়োজনের তুলনায়। এবং ফলাফল হিসেবে উক্ত ব্যক্তি হাইপোথাইরয়ডিজম এ আক্রান্ত হয়। এজন্য যেসব শিশু বা মানুষ আয়োডিন এর স্বল্পতায় ভুগে তাদের এই রোগ হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে বর্তমানে লবণের সাথে আয়োডিন গ্রহণের ফলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকাংশেই কমে এসেছে।

গলগন্ড বা Goiter

নডিউল(Nodule) ঃ

এছাড়া এই গ্রন্থিতে টিউমার ও হতে পারে। যাকে নডিউল(Nodule) বলে। এক্ষেত্রে এই টিউমার সংখ্যায় এক বা একাধিক হতে পারে। এবং বিভিন্ন আকারের হতে পারে। তবে টিউমার হলেই সবক্ষেত্রে ক্যান্সার হয়না। তবে অবস্থা বেশি খারাপ হলে এবং কোনো চিকিৎসা না নেয়া হলে এটি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। যাকে বলা হয় থাইরয়েড ক্যান্সার।

টিউমার বা Nodule

রোগ সনাক্তকরণঃ

থাইরয়েড এর বিভিন্ন রোগ সনাক্তকরণে সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়ঃ

রক্ত পরীক্ষাঃ 

রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করা যায়। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সাধারণত নিচের টেস্টগুলো কতা হয়ঃ

Thyroid stimulating hormone(TSH): এই পরীক্ষায় রক্তে TSH এর মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। রক্তে TSH এর মাত্রা কম হলে বুঝতে হবে হাইপারথাইরয়ডিজমে রোগী আক্রান্ত। আর বেশি হলে হাইপোথাইরয়ডিজমে আক্রান্ত।

Thyroxine hormone(T4): রক্তে উচ্চমাত্রার T4 এর উপস্থিতির অর্থ হাইপারথাইরয়ডিজম আর নিম্নমাত্রার T4 এর উপস্থিতির অর্থ হাইপোরথাইরয়ডিজম।

Tri-iodothyronine hormone(T3): রক্তে উচ্চমাত্রার T3 এর উপস্থিতির অর্থ হাইপারথাইরয়ডিজম আর নিম্নমাত্রার T3 এর উপস্থিতির অর্থ হাইপোথাইরয়ডিজম।

TSH receptor antibody(TSI): রক্তে TSI এর উপস্থিতির অর্থ রোগী গ্রেভস রোগ এ আক্রান্ত। এই রোগে চোখের চারপাশ ফুলে উঠে।

গ্রেভস রোগ

Anti-thyroid anti-body: রক্তে antithyroid antibody এর উপস্থিতির অর্থ রোগী  Hashimoto’s এবং গ্রেভস রোগ এ আক্রান্ত। Hashimoto’s এমন এক রোগ যেখানে পুরো থাইরয়েড গ্রন্থিটিই ধীরে ধীরে আক্রান্ত হয়ে যায়।

এছাড়া আরো কিছু পরীক্ষা যেমন নিউক্লিয়ার থাইরয়েড স্ক্যান, থাইরয়েড আল্ট্রাসাউন্ড, কম্পিউটারাইজড এক্সিয়াল টোমোগ্রাফি স্ক্যান (Computerized axial tomography scan) এর মত কিছু পরীক্ষার সাহায্যে ও থাইরয়েড গ্রন্থির বিভিন্ন রোগ সনাক্ত করা যায়।

সার্জারি ঃ

হাইপারথাইরয়ডিজম, গয়েটার এবং নডিউল কিংবা টিউমার হলে সেটির ক্ষেত্রে রোগের মাত্রা অনুযায়ী থাইরয়েড গ্রন্থির কিছু অংশ কিংবা পুরোটা কেটে ফেলতে হতে পারে অপারেশানের মাধ্যমে।

তবে ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে এই গ্রন্থির অর্ধেক কেটে ফেললেও রোগী তার বাকি অর্ধেক দিয়ে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে। তবে যাদের পুরো গ্রন্থিটিই কেটে ফেলেতে হয় তাদের বাকি জীবন আলাদাভাবে বাহির থেকে প্রয়োজনীয় হরমোন গ্রহণ করতে হয়।

এছাড়া বিভিন্ন নিউক্লিয়ার মেডিসিন, তেজস্ক্রিয় আয়োডিন ব্যবহার করে আক্রান্ত হবার মাত্রা নির্ধারণ করে চিকিৎসকেরা পরবর্তী পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

সুতরাং কোনো লক্ষণ দেখলে সেটাকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আর সুস্থ থাকতে বছরে অন্তত একবার রক্ত পরীক্ষা করে থাইরয়েড গ্রন্থির অবস্থা চেক করতে পারেন।

Categories
রোগের লক্ষন ও প্রতিকার

অর্শ বা পাইলস রোগের সম্ভাব্য লক্ষন প্রতিকার

অর্শ বা পাইলস হলো পায়ুপথে এবং মলাশয়ের নিম্নাংশে অবস্থিত প্রসারিত এবং প্রদাহযুক্ত শিরা। এই অর্শ মলদ্বারের ভেতরেও হতে পারে আবার বাইরেও হতে পারে। সাধারনত দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য অথবা গর্ভকালীন সময়ে এই সমস্ত ধমনীর উপর চাপ বেড়ে গেলে পাইলসের সমস্যা দেখা দেয়।

পাইলস বা অর্শ একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। ৫০ বছরের বেশি বয়সী লোকদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকেরই খোসপাঁচড়ার মত চুলকানি এবং রক্তপাত হয় যা থেকে পাইলসের উপস্থিতি আছে বলে ধারনা করা যায়। পাইলসের চিকিৎসায় অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (কোলোরেক্টাল সার্জন) কাছে যেতে হবে।

পাইলস কেন হয়?

পাইলস কেন হয়? তার সঠিক কারণ জানা সম্ভব না হলেও দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া, পানি কম খাওয়া, শাকসব্জী ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার কম খেলে, অতিরিক্ত ওজন, গর্ভাবস্থায়, লিভার সিরোসিস, বৃদ্ধ বয়সে, বেশী চাপ দিয়ে মল ত্যাগ করলে, বেশি মাত্রায় মল নরমকারক ওষুধ ব্যবহার করলে, টয়লেটে বেশী সময় ব্যয় করলে, পরিবারে কারও পাইলস থাকলে, দীর্ঘ সময় বসে থাকলে ইত্যাদি নানান কারনে অর্শ বা পাইলস বেশি হয়ে থাকে।

অর্শ বা পাইলসের লক্ষন ও উপসর্গসমূহ

  • পায়খানার সময় ব্যথাহীন রক্তপাত হতে পারে।
  • মলদ্বারে চুলকানি ও জ্বালাপোড়া হতে পারে।
  • মলদ্বারের ফোলা বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে আবার নাও পারে। অনেক সময় বের হলে তবে তা নিজেই ভেতরে চলে যায় অথবা হাত দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া যায়। আবার কখনও কখনও বাইরে বের হওয়ার পর তা আর ভেতরে প্রবেশ করানো যায় না অথবা প্রবেশ করানো গেলেও তা আবার বেরিয়ে আসে।
  • মলদ্বারের বাইরে ফুলে যায় যা হাত দিয়ে স্পর্শ ও অনুভব করা যায়।
  • পায়ুপথের মুখে চাকার মত হতে পারে।
  • কিছু কিছু ক্ষেত্রে মলদ্বারে ব্যথা হতে পারে।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

পায়খানা কালো বা লালচে হলে, পায়খানার সাথে রক্ত আসলে, পায়খানার সময় বা পরে পায়ুপথের মুখে চাকা অনুভব করলে, মলদ্বারে ব্যথা হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহন করতে হবে।

কি কি পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে?

  • সম্পূর্ণ মলনালীর পরীক্ষা করার জন্য ডিজিটাল রেক্টাল এক্সামিন বা আঙ্গুল দিয়ে পায়ুপথের পরীক্ষা করতে হতে পারে।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজন হলে কলোনোস্কোপী (Colonoscopy) করতে হতে পারে।

অর্শ বা পাইলস রোগে করণীয়

  • প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করতে হবে।
  • অত্যাধিক পরিশ্রম করা যাবে না।
  • পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসব্জী ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার খেতে হবে।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য অর্থাৎ পায়খানা যেন কষা না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
  • নিয়মিত এবং নির্দিষ্ট অথবা কাছাকাছি সময়ে মলত্যাগ করতে হবে।
  • এমন খাবার গ্রহণ করতে হবে যা সহজে হজম হয়।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করলে তা পায়খানার কষাভাব দূর করতে সাহায্য করবে।
  • অনেকসময় ধরে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা থাকা যাবে না।
  • প্রতিদিন কমপক্ষে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা ঘুমাতে হবে।
  • টয়লেটে অধিক সময় ব্যয় করা যাবে না।
  • শরীরের ওজন বেশি হলে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
  • মল ত্যাগের সময় বেশি চাপ দেয়া যাবে না।
  • দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা থাকলে তার চিকিৎসা নিতে হবে।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া লেকজেটিভ অধিক পরিমানে গ্রহণ করা যাবে না।

অর্শ বা পাইলস রোগে খাবার

শাকসবজি, ফলমূল, দধি, পনির, প্রচুর পানি, ডাল, সালাদ, গাজর, মিষ্টি কুমড়া, পাকা পেঁপে, বেল, আপেল, কমলা, খেজুর, লেবু, টক জাতীয় ফল, মুরগীর মাংস, চাল, আটা, ডিম, মাছ ইত্যাদি খেতে হবে। অপরদিকে খোসাহীন শস্য, চর্বিযুক্ত খাবার, মসৃণ চাল, কলে ছাঁটা আটা, ময়দা, চা, কফি, চীজ, মাখন, চকোলেট, কোমল পানীয়, আইসক্রীম, ভাজা খাবার যেমন- চিপস, পরোটা ইত্যাদি খাওয়া যাবে না।

অর্শ বা পাইলস রোগের চিকিৎসা

অর্শ বা পাইলসের চিকিৎসা সাধারনত পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, পাইলসের চিকিৎসায় কোনও অস্ত্রোপচার লাগে না। বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাইলসের চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। সাধারনভাবে চারটি পর্যায়ে পাইলসের চিকিৎসা করা হয়। 

প্রথম এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনও অস্ত্রোপচার লাগে না কিন্তু তৃতীয় এবং চতুর্থ পর্যায়ে অস্ত্রোপচার লাগে। কারন- 

তৃতীয় এবং চতুর্থ পর্যায়ে জিনিসটি যেহেতু বের হয়ে আসে এটি অস্ত্রোপচার করেই সরাতে হয়। রোগী যদি দেরি না করে তাহলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার ছাড়াই চিকিৎসা করা সম্ভব। পাইলসের আধুনিক চিকিৎসা এখন বাংলাদেশেই সম্ভব। 

মলদ্বারের ভিতরের অর্শ বাইরে বেরিয়ে আসে এবং বেরিয়ে আসার পর তা আর ভেতরে প্রবেশ করানো যায় না কিংবা হাত দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করালেও পরে তা আবার বেরিয়ে আসে সেক্ষেত্রে,

  • অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে মলদ্বার না কেটে অর্শ অপারেশন (Longo বা Stapled Haemorrhoidectomy) করা হয় অথবা ডায়াথারমি পদ্ধতি অথবা পুরনো পদ্ধতিতে অর্শ অপারেশন করা হয়।

শেষকথা

আমাদের সবুজ শাকসবজি ও আঁশজাতীয় খাবার বেশি করে খেতে হবে। বেশি বেশি পানি পান করতে হবে। নিয়মিত মলত্যাগের অভ্যাস করতে হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম দেখা দিলে কিংবা সমস্যায় আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করতে হবে। যদি কোনো কারণে মলের সাথে রক্ত দেখা যায় অথবা এ জাতীয় অন্য কোনো সমস্যা দেখা যায়, তাহলে অবশ্যই দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। তাহলে প্রাথমিক অবস্থায়ই রোগটিকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

Categories
রোগের লক্ষন ও প্রতিকার

জলাতঙ্ক রোগের সম্ভাব্য লক্ষন

মস্তিষ্কে রেবিস ভাইরাস যখন ছড়িয়ে পড়ে তখনই রেবিসের লক্ষণগুলো দেখা দিতে থাকে। প্রথম দু-তিন দিনের মধ্যে গা ম্যাজ ম্যাজ করা, মাথা ব্যথা, অবসাদ, বমিভাব, খিদের অভাব, জ্বর ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়।

অনেক ক্ষেত্রে দংশন স্থানে চুলকায়, ব্যথা করে, ঝিন ঝিন করে। এর পরের পর্যায়ে রোগী শব্দ, ঠান্ডা বাতাস সহ্য করতে পারে না। রোগী কোনও প্রকার তরল পদার্থ গিলতে পারে না। রোগীর মানসিক অস্থিরতা এবং কখনও কখনও ঝিমিয়ে পড়ার ভাব দেখা যায়। লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে তীব্র খিঁচুনি ও পক্ষাঘাতে রোগীর মৃত্যু হয়। 

জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশ পেয়ে গেলে সে রোগীকে বাঁচানোর কোনও টিকা বা ওষুধ চিকিৎসাবিজ্ঞানের জানা নেই। কিন্তু এ রোগ প্রতিরোধের টিকা (Anti-rabies vaccine-ARV) মানুষের করায়ত্ত। কুকুর বা বন্যপ্রাণী কামড়ালে (যে ক্ষেত্রে সম্ভব) জেনে নিতে হবে প্রাণীটি রেবিস আক্রান্ত ছিল কি না? রেবিস আক্রান্ত হলে দ্রুত ভ্যাকসিন নিতে হবে। আর প্রাণীটি রেবিস আক্রান্ত কি না জানা সম্ভব না হলে (রাস্তার কুকুর বা বন্যপ্রাণী কামড়ালে) অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শমতো ভ্যাকসিন নিতে হবে। কোন কুকুরটি রেবিসে আক্রান্ত তা জানার জন্য রেবিস আক্রান্ত কুকুরের রোগ লক্ষণ জানা জরুরি।

রেবিস আক্রান্ত কুকুরের লক্ষণ

রেবিস আক্রান্ত কুকুরের দু’ ধরনের লক্ষণ দেখা যায়

১) উন্মত্ত আচরণ, অস্বাভাবিক ভাবভঙ্গি, উদ্দেশ্য ছাড়াই ছুটে বেড়ানো, বিকৃত ক্ষুধা, বিকৃত আওয়াজ করা, শরীরে কাঁপুনি, বিনা প্ররোচনায় কামড়ানো, মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, ডাক কর্কশ হওয়া, পক্ষাঘাতে পায়ের ভারসাম্য হারানো, অবশেষে শ্বাসকষ্ট হয়ে মৃত্যু।

২) মৌন আচরণ : নিস্তেজ হয়ে ঝিমোতে থাকা, বিকৃত স্বরে ধীরে ধীরে ডাকা, মানুষের চোখের আড়ালে থাকা, শরীরে কাঁপুনি ও পক্ষাঘাত দেখা দেওয়া এবং সব শেষে মুত্যৃ। সাধারণত রোগ লক্ষণ প্রকাশের সাত দিনের মধ্যেই কুকুরটি মারা যায়। যদি কামড়ানোর ১০ দিনের মধ্যে লক্ষণগুলো প্রকাশিত না হয়, তবে কুকুরটি রেবিসে আক্রান্ত নয় বলে মনে করতে হবে। তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই এবং ভ্যাকসিনও নিতে হবে না। কিন্তু যদি কামড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা বেশি হয় অথবা হাত, মাথা, মুখ ও ঘাড়ে কামড়ায় তবে সাথে সাথে ভ্যাকসিন নেওয়া শুরু করে ১০ দিন পর কুকুরটি সুস্থ থাকলে ভ্যাকসিন বন্ধ করা যেতে পারে। জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন প্রথম আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর।