Categories
রোগের লক্ষন ও প্রতিকার

হার্ট এটাকের কারণ ও সতর্কতা

হৃৎপিন্ড সম্পূর্ণ শরীরে রক্ত সরবরাহের কাজ করে থাকে। করোনারি আর্টারি নামে হৃৎপিন্ডের গায়ে ছোট দুটি ধমনী আছে। এই করোনারি আর্টারিতে কোলস্টেরল জমে ধমনীর রক্ত প্রবাহে বাধা সৃষ্টির ফলে হৃদযন্ত্রে রক্তাল্পতা জনিত কারণে অক্সিজেনের সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে হার্ট এ্যাটাক (মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কসন) হয়। প্রতি মিনিটে প্রায় ৭২ বার স্পন্দনের মাধ্যমে হৃৎপিন্ড সারাদেহে পাম্পের মত রক্ত সরবরাহ করে। এই হৃদযন্ত্রের কাজ বাধাগ্রস্থ হলে সেটা সারা দেহের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। হার্ট এটাকে বুকে প্রচন্ড ব্যাথার অনুভূতি হয় এবং এই ব্যাথা মোটামুটিভাবে ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগী হাসপাতালে পৌছার পূর্বেই মৃত্যুবরন করেন। হার্ট এ্যাটাকের সময় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে রোগীর মৃত্যু হতে পারে। আবার অনেক সময় রোগী বুকে ব্যাথা অনুভব করেন এবং সেটা কিছু সময় পরে সেটা সেরে যেতে পারে।

হার্ট এটাকের কারন

স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা সম্পৃক্ত চর্বি হৃদপিন্ডের করোনারি আর্টারিতে জমে এবং ধমনী প্রাচীর মোটা হয়ে সহজে রক্ত প্রবাহিত হতে পারে না এবং রক্ত জমাট বেঁধে যায়। এটাই হার্ট এটাকের কারন।

হার্ট অ্যাটাক কাদের হতে পারে

কিছু বিষয় আছে যেগুলো নিয়ন্ত্রন করা যায় না আবার কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো নিয়ন্ত্রন করা যায় না। সাধারনত যেসকল কারনে হার্ট অ্যাটাক হতে পারেঃ

  • হার্ট এটাক সব বয়সে একরকমভাবে হয় না। সাধারনত মধ্যবয়সে কিংবা বৃদ্ধ বয়সে এ রোগটি বেশি হতে পারে।
  • সাধারনত মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের অনেক বেশি হয়।
  • বংশে কারও হার্ট এটাক হয়ে থাকলে হার্ট এটাকের ঝুকি অনেক বেশি থাকে।
  • ধুমপান, মদ্যপান ইত্যাদি কারনে হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি অনেক বেড়ে যায়।
  • ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাইপার লিপিডেমিয়া ইত্যাদি রোগের কারনে হার্ট এটাক হতে পারে।
  • শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে মুটিয়ে যাওয়া বা স্থূলতা হার্ট এটাকের একটি কারন।
  • অধিক হারে চর্বি জাতীয় খাদ্য গ্রহন করলে এবং শাক সবজি ও আঁশ জাতীয় খাবার কম খেলে।
  • অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা অশান্তির ফলে।
  • জন্মনিয়ন্ত্রক পিল বা অন্য কোন হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ সেবনের ফলে।

কখন হতে পারে?

হার্ট এটাকের কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। যেমন- এটি রাতে ঘুমের মধ্যে হতে পারে, বিশ্রামের সময় হতে পারে, ভারী শারীরিক পরিশ্রমের সময় হতে পারে আবার মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে হতে পারে ইত্যাদি। শতকরা ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক হয় এবং রোগী আর ঘুম থেকে জাগে না। হার্ট এটাক যেকোন সময়ই হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ বা উপসর্গসমূহ

  • নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা অথবা শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
  • বমি বমি ভাব অথবা বমি হতে পারে।
  • বুকে মারাত্মক তীব্র ব্যথা হতে পারে।
  • বুকে চাপ অনুভুত হওয়া, যন্ত্রণা হওয়া কিংবা ভারী ভারী লাগা।
  • বিষম খাওয়া।
  • শরীরে প্রচুর পরিমানে ঘাম হতে পারে।
  • খাবার হজমে সমস্যা হবে এবং পেটের উপরের অংশে জ্বালাপোড়া করতে পারে।
  • চোখে ঝাপসা দেখা, অন্ধকার দেখা ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে।
  • হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হলে রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।

হার্ট এটাক হলে করনীয়

  • আক্রান্ত ব্যক্তিকে এক মুহুর্ত দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
  • কোনভাবেই রোগী নিজে পায়ে হেঁটে কিংবা নিজেই গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেবেন না।
  • হার্ট এটাক হয়েছে নিশ্চিত হলে, রক্ত জমাট বাঁধা বন্ধ করতে রোগীকে তাৎক্ষণিক এসপিরিন বা ওয়ারফেরিন জাতীয় ওষুধ খাওয়ানো যেতে পারে।
  • জিহবার নিচে নাইট্রোগ্লিসারিন স্প্রে দিতে হবে।
  • রোগীকে মানসিকভাবে আশ্বস্ত করতে হবে।
  • কমপক্ষে দুইজন হাসপাতালে রোগীর সাথে যাবেন। এতে রোগ সনাক্ত ও চিকিৎসা শুরুর সময় কিছুটা কমানো যায়।

হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে করনীয়

  • মানসিক অবসাদ বা দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে।
  • নিয়মিত ব্লাড প্রেসার পরিমাপের মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে।
  • নিয়মিতভাবে ডায়াবেটিস পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রন করতে হবে।
  • ধুমপান, মদ্যপান ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • মোটা হওয়া বা স্থূলতা নিয়ন্ত্রন করতে হবে।
  • চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়া কমাতে হবে এবং রক্তে কোলেস্টোরলের মাত্রা কমাতে হবে।
  • শাকসবজি, ফল বেশি করে খেতে হবে।
  • প্রতিদিন নিয়মিতভাবে হাঁটা, দৌড়ানো কিংবা কোন শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।

হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা

  • হার্ট এটাকের চিকিৎসায় রোগীকে দ্রুত নিকটস্ত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এরকম ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পূর্বে কিংবা নেওয়ার মধ্যবর্তী রাস্তায় পর্যাপ্ত পরিমানে আলো বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে। রোগীর জিহবার নিচে একটি নাইট্রেট ট্যাবলেট দিতে হবে।
  • হাসপাতাল নির্বাচনের ক্ষেত্রে, হৃদরোগের চিকিৎসা সুবিধা সংবলিত হাসপাতাল হলে উত্তম। হাসপাতালে ভর্তি করে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে ধারাবাহিক চিকিৎসা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
  • হাসপাতালে নেবার পর চিকিৎসক প্রয়োজন অনুসারে চিকিৎসা শুরু করবেন। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে রোগীর ECG করতে হতে পারে, অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে আবার ইনত্রা ভেনাস ফ্লুইড কিংবা নাইট্রোগ্লিসারিন দিতে পারেন।
  • প্রথমে এনজিওগ্রাম করে ব্লকের পরিমান নির্ণয় করতে হবে। যদি ব্লক বেশি হয় এবং ওষুধে সমাধান হবে না বলে মনে হয়, তবে এনজিওপ্লাস্ট করতে হতে পারে। এক্ষেত্রে সার্জন ছোট হয়ে যাওয়া ধমনীতে প্রয়োজন অনুসারে কয়েকটি মাইক্রো রিং পরিয়ে দিবেন।
  • এরপরেও আবার হার্ট এটাক হলে, চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে ওপেন হার্ট সার্জারি বা বাইপাস সার্জারি করতে পারেন। এক্ষেত্রে সার্জন পা থেকে একটি শিরা কেটে নিয়ে সেটি দিয়ে ধমনীর সমস্যাযুক্ত অংশ দিয়ে স্বাভাবিক রক্ত প্রবাহের একটি বাইপাস রাস্তা তৈরি করে দিতে পারেন।

শেষ কথা

জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে, নিয়মিত রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রন, প্রতিদিন ব্যায়াম, ধূমপান কিংবা মদ্যপানের মত বাজে অভ্যাস পরিত্যাগ, বাড়তি লবণ না খাওয়া, তেল বা চর্বি জাতীয় খাবার কম খাওয়া, মিষ্টি কম খাওয়া, শাক সবজি ও ফলমূল বেশি করে খাওয়া এবং মানসিক দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হার্ট এটাকের ঝুঁকি থেকে অনেকটা নিরাপদে থাকা যাবে। আধুনিক বিশ্বে অপরিণত বয়সে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান একটি কারণ হার্ট এটাক। হার্ট এটাকের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কারণকে দায়ী করা যায় না, তাই জীবনযাপনে পরিবর্তন এনে প্রতিরোধের মাধ্যমে সুস্থ্যভাবে বেঁচে থাকতে হবে। সতর্ক জীবনযাপনের পরেও হার্ট এটাক হলে, তার মাত্রা ও তীব্রতা অনেক কম হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *